দুই একটা ব্যক্তিগত অবজারভেশন শেয়ার করি, ভূলও হতে পারে।
শীতের রাত্রে বাস জার্নিতে সামনের দিকে বসলে ভয়ই লাগে। সামনে পাচ হাত রাস্তাও দেখা যায় না। অথচ চালক নির্দ্বিধায় চালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ রাস্তা তার মুখস্থ হয়ে গেছে। বার বার চলতে চলতে রাস্তার জ্ঞানে তার প্রায় ইয়াকিন এসে গেছে। তাই সে ভয় না পেয়ে যতটুকু দেখা যায় সেটুকু আমলে নিয়ে আল্লাহ ভরসা করে চালিয়ে যাচ্ছে। যে চালকের বিশ্বাস ঐ পর্যন্ত পৌছায় নি, সে চালাতে গেলে ভয় পেয়ে নালায় নামিয়ে দেয়ার সম্ভাবনাই বেশী।
আমাদের জীবনে চলার পথে আমরা সব কিছু হিসাব করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই। যে যে বয়সেই থাকুক না কেন, সেখান থেকে তার রিটায়ারমেন্ট, মৃত্যু এমনকি নাতি পুতিদের জামানার নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে চায় অনেকে। জিনিসটা পুরোপুরি খারাপ সেটা বলছি না। তবে এটা করতে গিয়ে দুনিয়াবি আসবাবের উপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যায়, সম্পদ ব্যয় করতে গিয়ে কুন্ঠাবোধ চলে আসে, বিশ বছর পরের অনাহুত আশংকায় কাপতে থাকে, রিযক নিয়ে শংকিত থাকে। আর এসব পেরেশানির কারণে তার যোগ্যতা, তার সামর্থ্য অনুপাতে ভালো কাজের তৌফিক হয় না। অথচ রিযিক নির্ধারিত—এটা তাওয়াক্কুলের ভিত্তি; আর রিযিকের জন্য চেষ্টা, সঞ্চয়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা—এসবও শরিয়তসম্মত আসবাবের অংশ। কিন্তু অন্তরের নির্ভরতার জায়গা ঠিক না থাকলে এসবকিছুর ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়।
আমি আজ পর্যন্ত কাউকে দেখি নি, বাপ দাদার রেখে যাওয়া সম্পদের উপর ভর করে একেবারে পেরেশানিমুক্ত জীবন যাপন করছে। কারণ এটা জীবনের অংশ। জীবনে উত্থান পতন থাকবেই। যার সম্পদে পেরেশানি নাই, তার হয়ত স্বাস্থ্য নিয়ে পেরেশানি, যে সুস্বাস্থ্যবান সম্পদশালী, তার হয়ত সন্তান নিয়ে বিপদে আছে, যার এগুলো নেই সে হয়ত ছোট খাট বিষয় নিয়েই অনেক অস্বস্তিতে থাকে।
বাপ যে সামাজিক অবস্থানে ছেলেমেয়েকে রেখে যাবে, তাদের উপর সেই অবস্থান অনুযায়ীই সামাজিক এক্সপেক্টেশন, পিয়ার প্রেসার এগুলো সেট হয়ে যাবে। কাজেই কেউ যদি মনে করে নিজের সবটা উজার করে সন্তানের জন্য রেখে যাবে সে ভুলের মধ্যে আছে বলেই মনে হয়।
অথচ আমাদের প্রত্যেকের জীবন নিয়ে আল্লাহ তায়ালার কাছে জবাবদিহি করতে হবে। আমার সময়ের কত অংশ ভালো কাজে ব্যয় হয়েছে, আমার যোগ্যতার কত অংশ, আমার সম্পদের কত অংশ ব্যয় করেছি। এখানে ভালো কাজ বলতে কেবল প্রচলিত ভালো কাজ নয়, বরং আল্লাহ তায়ালা যেটাকে উত্তম কাজ বলেছেন সেটাই উত্তম ও ভালো কাজ।
কিভাবে জীবনযাপন করতে হবে, কিভাবে লক্ষ্য সেট করতে হবে, কোন পথে গেলে আল্লাহর সাহায্য আসবে সেগুলো কুরআন সুন্নাহয় রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবীগণ তাদের জীবনে এগুলোর দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। আগামীকালের রিযিক নিয়ে তারা চিন্তিত হতেন না, তারা অর্থ আয় করতেন, একইভাবে আল্লাহর রাস্তায় ব্যয়ও করতেন। তারা দূরদৃষ্টসম্পন্ন ছিলেন, তবে তারা সেটা দীন ও উম্মাহর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছেন।
তারা ছিলেন ইয়াকীনে পরিপূর্ণ। কাজেই তাদের সামনে পেরেশানি আসলে, অস্পষ্টতা আসলে কনফিউজড হতেন না, নিজেদের কাছে কুরআন সুন্নাহর যে জ্ঞান আছে তার উপর ভিত্তি করে এগিয়ে যেতেন, ফলে আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। অন্যদিকে আমরা দূর ভবিষ্যতেও যদি কোন সমস্যা উদ্ভব হবার সম্ভাবনাও দেখি, তবে উপায় উপকরণ খুঁজতে থাকে কিভাবে সেটা এড়ানো যায়, আর এক্ষেত্রে আমাদের ভরসা থাকে পুরোপুরি দুনিয়াবী সম্পর্ক, সম্পদ, বা অন্য কোন উপায়ের উপর। এ কারণে আমরা যতটুকু সম্পদ ব্যয় করা দরকার, তা না করে জমাইতে থাকি, আর আশায় থাকি, এই সম্পদ, এই সন্তান আমাদেরকে উদ্ধার করবে। অথচ রক্ষা করার একমাত্র মালিক আল্লাহ তাআলা।
তাহলে কি আমরা পরিকল্পনা করব না, উপায় উপকরণ অবলম্বন করব না? অবশ্যই করব। আমরা যদি শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালার সাহায্যের উপরই ভরসা করি, দুনিয়াবি উপায় অবলম্বন না করি, তবে এতে যেসব ইফেক্ট আসবে, তা পারি দেবার জন্য আমাদের ঈমান সেই স্তরের হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, কেউ আল্লাহর উপর ভরসা করে কোন খাবার না নিয়ে মরুভূমি বা জংগলে ধ্যানে বসে গেলো, তবে এক্ষেত্রে তার ইমান ইয়াকিনও ওই লেভেলের হতে হবে যাতে এর ফলে যে ক্ষুধা তৃষ্না আসবে তা তাতে কমতি সৃষ্টি না করে। যেহেতু আমাদের ঈমান আমল ঐ লেভেলের না, তাই অন্তত এতটুকু উপায় অবলম্বন করা উচিত যেটাতে এমন ইফেক্ট আসল যা আমাদের জন্য টলারেবল হয়, সহ্যক্ষমতার বাহিরে না যায়। আর এক্ষেত্রে আমাদের ইলম যত বাড়বে, আল্লাহ তায়ালার উপর তাওয়াক্কুল যত বাড়বে, আল্লাহর কাছে আমরা যত চাইতে থাকব, তিনি আমাদের তৌফিক দিবেন, আমরা তত বেশী ত্যাগ করতে পারব, পথ অস্পষ্ট হলেও সঠিক পথে তত চলার সাহস পাব, আমাদের জন্য কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়াও সহজ হয়ে যাবে। আর আমাদের অন্তর যত সংকুচিত হবে,তত আমরা ভীত হয়ে পড়ব, স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর রাস্তাও আমাদের জন্য ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে, আমরা তখন গ্যারান্টি চাব, যেন আমরা এ দুনিয়া কোনদিন ছেড়ে যাব না। অথচ আমাদের সময় সংক্ষিপ্ত, আমাদের জীবনই রিস্কময়, তবুও কি আশা আমাদের! আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বুঝার তৌফিক দান করুন।