পরীক্ষা

পরীক্ষা

যুগে যুগে আল্লাহ তায়ালা যত নবী রাসূল পাঠিয়েছেন, তাদের প্রায় প্রত্যেকেরই কম সংখ্যক অনুসারী ছিল। বেশীরভাগ মানুষই তাদের অনুসরণ করে নি। এর মানে কি যে তারা নবী সেটা বেশীরভাগ মানুষ জানত না? আল্লাহ তায়ালা নবী রাসূলদেরকে বিভিন্ন মুজিযা বা নিদর্শন দিয়েছেন যাতে মানুষ তাদের চিনতে পারে। তাই অনেকেই জানত, কিন্তু মানত না। এর কারণ ছিল তাদের অনুসরণ করলে এমন জীবনযাপন করতে হয়, বা এমন কাজকর্ম করতে হয় যা সমাজের প্রচলন বিরোধী, অথবা এমন কিছু করতে হয় যার জন্য অনেক কষ্ট আর ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে অর্থকষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, শক্তিশালী শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লড়তে হয়, কিংবা শখের বাড়িঘর সন্তানসন্ততি ছেড়ে যেতে হয়। একেক জাতির জন্য এটা একেক রকম ছিল।

এগুলো আল্লাহ তায়ালার পরীক্ষা। সব জাতিকে তিনি এক রকমের পরীক্ষা করেন নি, সবার পরীক্ষার তীব্রতা এক ছিল না। তবে সেগুলো তীব্রতা সমান না হলেও বেশীরভাগ মানুষই সেগুলোতে আটকা পড়ে যেত।

আজ নূহ আলাইহিস সালামের কাহিনী আমাদের জানা আছে, তাই ওই সময় আমাদের নিয়ে গেলেই কি আমরা শুকনো অবস্থায় তার প্রতি ঈমান আনতাম? এটার সম্ভাবনা কতখানি যে আমরা শুকনো মাটির উপর তার নৌকা বানানো দেখে হাসাহাসি করতাম না?

অথবা লুত আলাইহিস সালামের সমাজে যেখানে সম-কামিতা স্বাভাবিক জিনিস ছিল, সেটাকে অস্বাভাবিক মনে করতাম?

অথবা তালূতের সেনাবাহিনীতে থাকতে নদীর মাত্র এক আঁজলা পরিমাণ পানিতে সন্তষ্ট থাকতে পারতাম, যেখানে অল্প সংখ্যক মানুষ সেই নদী পার হয়ে জালুতের সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হতে পেরেছিল?

কিংবা নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় থাকতে মক্কার বিরূপ পরিবেশে ইসলামকে সন্তষ্ট চিত্তে গ্রহণ করতাম, তার আহবানে ধন সম্পদ সন্তান সন্ততি সব ফেলে মদিনায় স্থায়ীভাবে চলে যেতাম অথচ যেখানে যাচ্ছি সেখানে কি অপেক্ষা করছে তা জানিনা?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের জানা নেই। তবে বর্তমানেও অনেক প্রশ্ন আছে যেগুলো আমাদেরকে করলে আমরা আটকে যাব।

আমি আল্লাহ তায়ালাকে বিশ্বাস করলেও, আখিরাতে কোন কাজের জন্য কি শাস্তি তা জেনেও কি আল্লাহ তায়ালার বিধান নিঃশর্তভাবে অনুসরণ করছি?

সুদ, ঘুষ খাওয়া হারাম জেনেও কি সেগুলো থেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করছি?

অন্যায় অবিচার দেখেও কি প্রতিবাদ করতে পারছি?

সামান্য আরাম আয়েশের জন্য শুধু গাফলতে কি নামাজ, রোজা ছেড়ে দিচ্ছি? কিছু অর্থ সম্পদ কমে যাবে বলে কি যাকাত দিতে কুণ্ঠাবোধ করছি? বিপুল সম্পদের পাহাড়ের উপর শুয়ে থেকেও কি হজ্জে যেতে গাফিলতি করছি?

অন্যের হক ঠিকমতো আদায়ের চেষ্টা করতে পারছি? নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব, গচ্ছিত আমানত সঠিকভাবে আদায় করতে পারছি?

আমার উপর আল্লাহর দেয়া নিয়ামতগুলোর শুকরিয়া আদায় করছি?

প্রতিদিন কয়টি মন্দ কাজ যা করতে শরীয়াহ নিরুৎসাহিত করে তা থেকে বিরত থাকতে পারছি?

প্রতিদিন কয়টি ভালো কাজ যা করতে শরীয়াহ উৎসাহিত করে তা করতে চেষ্টা করছি?

আমি কি সামান্য কিছু ত্যাগের বিপরীতে, কিছু কষ্টের ভয়ে, অভাব অনটনের ভয়ে, আরাম-আয়েশ আর সম্মান হারানোর ভয়ে আল্লাহর নির্দেশের বিপরীতে অজুহাত দাঁড় করাচ্ছি না? নিজের সাথে নিজে সৎ থাকতে পারছি?

বেশীরভাগ প্রশ্নের উত্তর যদি না হয় তবে বুঝতে হবে আমার উপর যে পরীক্ষাই নেয়া হচ্ছে তাতেই ফেল। বড় বড় পরীক্ষা নেয়ার দরকার পড়ছে না। ছোট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তবেই না বড় পরীক্ষা দেয়ার যোগ্যতা হবে।

আমাকে পরীক্ষা দেয়ার জন্য ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান, আফগানিস্তান যেতে হবে না। আমার পরীক্ষা আমার বাড়িতে, আমার কর্মক্ষেত্রে, আমার দৈনন্দিন জীবনে নেয়া হচ্ছে।

আমার কাটানো প্রতিটা মুহুর্ত আমার পরীক্ষার অংশ, আমার বলা প্রতিটা কথা, আমার নেয়া প্রতিটা পদক্ষেপ, আমার ব্যয় করা প্রতিটা অর্থ আমার পরীক্ষার অংশ। আমার নেয়া প্রতিটা সিদ্ধান্ত পরীক্ষার একেকটা উত্তর।

আমার জীবন আমার পরীক্ষা, আমার মরণ আমার পরীক্ষা।

আমি গরীব, মধ্যবিত্ত বা ধনী হতে পারি, আমার হাত না থাকতে পারে, কিংবা আমার জীবন দেখতে সুখী সমৃদ্ধ মনে হতে পারে। আমাকে আমার লেভেল অনুযায়ী জবাবদিহিতা করতে হবে, পরীক্ষা দিতে হবে।

এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে আমাকে সতর্ক হতে হবে, ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা থাকতে হবে, ভুল সঠিকের ইলম জানতে হবে, ভালোমন্দ চিনতে হবে, এসবের বিনিময় কি জানতে হবে। শুধু জেনে ক্ষান্ত দিলেই হবে না, মানার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। আর সর্বোপরি আল্লাহ তায়ালার কাছে তার অনুগ্রহ চাইতে হবে।

আমাদেরকে তাই বলতে হবে যা ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে বলতে বলা হয়েছিল,

‘নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ সারা জাহানের রব আল্লাহর জন্য।’

পেশায় তড়িৎ প্রকৌশলী। মাঝে মাঝে কিছু লিখতে ইচ্ছা হয়। কিছু লিখি। তারপর আবার মুছে ফেলি। লেখা আর মুছে ফেলার মাঝে কিছু থেকে যায়। সেগুলোর জন্যই এখানে আসা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top