স্বার্থপরতা

স্বার্থপরতা

মানুষ মাত্রই স্বার্থপর। এটা মানুষের ফিতরাত বা স্বভাব। কেউ কম, কেউ বেশী। এটা থাকে বলেই বেঁচে থাকতে পারে। অন্যদের চেয়ে আল্লাহ আমাদেরকে নিজের কাছে প্রিয় বানিয়ে দিয়েছেন।

স্বার্থপরতা অর্থবিত্ত আর ভোগবিলাসের ক্ষেত্রেই হতে হবে তা না। সেটা হতে পারে মানসিক চাহিদার ক্ষেত্রেও। আবেগ অনুভুতির ক্ষেত্রে।

এই যেমন কেউ মারা গেলে আমরা দুঃখিত হই। মৃতের আত্মীয়রা কান্না করে। তার স্ত্রী সন্তান কষ্ট পায়। আমরা যে কষ্ট পাই সেটা কি ধরণের? আমরা কিন্তু খুব কম সময়ই মৃত ব্যক্তির কি হবে সেটা নিয়ে ভাবি। বেশীরভাগ সময় আমাদের নিজেদের অনুভূতি এক্ষেত্রে আমাদের কষ্ট দেয়। মৃতের স্ত্রী সন্তান কষ্ট পায় এই কারণে যে তারা ওই ব্যক্তির কাছ থেকে এই মুহুর্তে যে আর্থিক, ব্যক্তিগত ও মানসিক সাপোর্ট পেত ওইটা দেয়ার মত কেউ নাই। আমরা কষ্ট পাই ওই ব্যক্তিকে হারিয়ে যে মানসিক শূন্যতা তৈরি হয় তা থেকে। হয়ত পাড়ার বড় ভাই ছিলেন। হেসে দুই একটা কথা বলত। এইটা এই মুহুর্তে পাব না – এই ধরণের ভাবনাগুলো আমাদের কষ্ট দেয়। এরপর ক্রমান্বয়ে যখন মৃতের স্ত্রী সন্তান স্বাবলম্বী হয়, তারা ওই ব্যক্তিকে ভুলে যেতে থাকে। আবার বলছি এই স্বাবলম্বীতা আর্থিক হতে পারে, সামাজিক হতে পারে আবার মানসিক হতে পারে। তবে যতদিন ওই ব্যক্তির প্রয়োজনীয়তা আমাদের কাছে থাকবে ততদিন তাকে ভোলা দুস্কর।

এই ভুলে যাওয়াটা আমাদের জন্য প্রয়োজনীয়। আমরা যদি মৃতদের না ভুলতাম, তাহলে বাঁচতে পারতাম না। পাগল

হয়ে যেতাম। আমাদের বাঁচার স্বার্থেই আল্লাহ আমাদেরকে ভুলিয়ে দেন।

যাইহোক এত কথা বলার অর্থ হল – একজন মানুষ যেহেতু ফিতরাতগতভাবে স্বার্থপর, তাই ইসলাম মানুষকে স্বার্থপর হতে নিষেধ করে না। ইসলাম ফিতরাত বা স্বভাবজাত ধর্ম।

একজন মুসলিমের উপর সবার আগে নিজের হক আদায় করতে হবে। নিজেকে উজাড় করে সন্ন্যাসী হয়ে অন্যের উপকারে বিলীন হয়ে যাওয়ার কোন কন্সেপ্ট এখানে নাই। সে নিজের হক যেমন- বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় খাওয়াদাওয়া

ও অন্যান্য চাহিদা পূরণ করা, নিজের ইমান-আমল ঠিক করা, আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি নেয়া ইত্যাদি।

নিজের হক আদায়ের পর সে অন্যের হক আদায় করবে। তবে এখানেও নিজের স্বার্থ জড়িত। আমি যে কাজই করব তা হবে সওয়াবের আসায়, আল্লাহর জন্য। আমি আমার বাবা-মার হক আদায় করব এই জন্য যে আল্লাহ তা করতে বলেছেন। আমি অন্যকে আর্থিক, সামাজিক বা মানসিক যেই সাহায্যই করি না কেন সেটাও আল্লাহর সন্তষ্টির আশায়, আমার পরকালীন স্বার্থের জন্য।

এই ব্যাপারটার একটা সুবিধা আছে। প্রত্যেক ক্রিয়ার একটা প্রতিক্রিয়া থাকে। নরমালি কাউকে আমি সাহায্য করা মাত্রই, তার কাছে থেকে অবচেতনভাবে আমার একটা প্রতিদান পাওয়ার আশা তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু আমি যদি পরকালীন স্বার্থে করি, তবে আল্লাহর কাছ থেকে আমি প্রতিদানের আশায় থাকব। তাই ওই ব্যক্তির কাছে আমার আশা তৈরি হবার সম্ভাবনা কম। ফলে কখনো যদি সে আমাকে উল্টা প্রতিদান নাও দেয় আমার আশাহত হবার সুযোগ নাই।

এখানে আরেকটা ব্যাপার এই যে অন্যকে সহযোগিতা যেন মাত্রা অতিক্রম না করে সেটাও ইসলাম নিশ্চিত করে। তাই অন্যকে দান করতে করতে এমন অবস্থা করা যাবে না যাতে নিজেই দানের উপযোগী হয়ে যাই। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু বান্ধবের জন্য নিজের জীবন- যৌবন উতসর্গ করার ধ্যান ধারণা ত্যাগ করতে হবে। তবে হ্যাঁ, সার্বিকভাবে চিন্তা করতে হবে কোন ভাবে করলে কাজটা নিজের ও অন্যদের সহায়ক হয়। এমন যেন না হয় শুধু অন্যের হক আদায় হল, নিজেরটা হল না।

ইসলাম ভারসাম্যের কথা বলে। এখানে ব্যক্তিগত বা সামাজিক জীবনে এমন অবস্থান নেয়া যাবে না যেটাতে এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান একদিকে ঝুঁকে যায়। এতে কেউ না কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবার আশংকা থাকে। সেই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি হতে পারে সে নিজে অথবা অন্য কেউ।

তাই মুমিন মাত্রই স্বার্থপর। দুনিয়া ও আখিরাতের স্বার্থে সে কাজ করে। যে কাজটা আমাদের কাছে নিঃস্বার্থ মনে হয়, সেটাতেও সে লাভের আসা করে আল্লাহর কাছ থেকে।

পেশায় তড়িৎ প্রকৌশলী। মাঝে মাঝে কিছু লিখতে ইচ্ছা হয়। কিছু লিখি। তারপর আবার মুছে ফেলি। লেখা আর মুছে ফেলার মাঝে কিছু থেকে যায়। সেগুলোর জন্যই এখানে আসা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top