সন্দেহ, অবিশ্বাস এবং আমি

সন্দেহ, অবিশ্বাস এবং আমি

দ্বীনের বুঝ পাবার পর আমাদের দেশে কারো চলাই মসৃণ না।

মাঝে মাঝেই পত্রিকাগুলো, রাজনীতিবিদরা এদেশের মানুষকে পরিচয় করিয়ে দেয় ধর্মপ্রাণ মুসলিম হিসেবে। আমার কাছে এর একটা অর্থ এই যে এদেশে ইসলামের একটা বাউন্ডারি তৈরি হয়েছে বা করে দেয়া হয়েছে।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবী (রা), তাবেয়ী যুগের ইসলামের থেকে আর ভালো কোন সংজ্ঞা আছে কি না আমার জানা নাই। হ্যাঁ, ছোট খাট বিষয়গুলোতে মতভেদ আছে। যার কারণে মাজহাব গুলোতে মাসআলা ভিন্ন ভাবে আসে। সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু ইসলামের মূল স্বরূপ উপলব্ধি করতে হলে আমাদেরকে নববী যুগে ফিরে যেতে হবে।

আমাদের দেশে ইসলামের এতই সংকীর্ণ সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে যে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের উপলব্ধি আর নববী যুগের ইসলামকে উপলব্ধি করার মধ্যে অনেক ফারাক।

দাড়ি রাখা ইসলামের একটা সন্দেহাতীত বিধান। অথচ একজন সাধারণ তরুণ দাড়ি রাখা শুরু করার সাথে সাথেই তৈরি হয় অবিশ্বাস। সাথে বিদ্রুপ, ঠাট্টা ইত্যাদি তো বোনাস। আর আশেপাশের মানুষের থেকে সবার পূর্বে অবিশ্বাস ও সন্দেহ আসে পরিবার থেকে। ছেলে কি তাহলে জংগী হয়ে গেল?

অথচ এই ছেলেটার সততা, চরিত্র, আমানতদারিতা এই সব কিছু এতদিন ছিল উদাহরণ দেয়ার মত। ইসলামের একটি সুস্পষ্ট বিধান মানার কারণে তাকে মুহুর্তের মধ্যে সন্দেহের চৌকাঠে বন্দী করা হচ্ছে। তাকে এখন জানপ্রাণ দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করতে হবে যে কোন দল বা গোষ্ঠীর সাথে তার কোন সম্পর্ক নাই।

একটু ঠান্ডা মাথায় এই জিনিসটা চিন্তা করুন তো রসুলুল্লাহ (সা) বা সাহাবিদের দৃষ্টি দিয়ে একটু দেখুন তো এই সন্দেহটা কোন ইসলামের মধ্যে যায়। এই যে সীমারেখা এর ভিত্তি কি?

যাই হোক, যখন পূর্ণাঙ্গ সুন্নতি লেবাস ধারণ করে তখনো এই সন্দেহ ও অবিশ্বাস রয়ে যায়। হয়ত মুখে বলে না, পিছনে বলে, ভিতরে রাখে। নিশ্চয়ই কোন না কোন দলের সাথে সে জড়িত। এই দৃষ্টিভঙ্গি এক দুই জনের হলে আমার মাথাব্যাথা ছিল না। এখন এই দৃষ্টিভঙ্গি সিংহভাগ লোকের। এবার এই ব্যাপারটাকে রাসুলুল্লাহ (সা) ও সাহাবীর যুগের সাথে কল্পনা করুন যে সাকিব, নেইমার, অমুক তমুককে ছেড়ে রাসুল (সা)কে আদর্শ মানার কারণে আমার মুসলিম ভাই আমাদেরকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছে।

আরেকটু আগানো যাক। ইসলাম ইনসাফের ধর্ম, ন্যায়ের পক্ষে ও অন্যায়ের বিপক্ষে কথা বলার ধর্ম। আগের ওই ছেলেটাই অন্যায়কে আংগুল দিয়ে দেখাতে চাইলেই ষোলকলা পূর্ণ হয়। এবার তাকে ট্যাগানো হবে। জঙ্গি, সন্ত্রাসী, জামাত, শিবির, যেটা দিয়ে সুবিধা হয়। তুই সুন্নতি লেবাস পড়ছিস পর, সমাজ নিয়ে, ন্যায়-অন্যায় নিয়ে তোকে কে কথা বলতে বলেছে। নিজের ধর্ম নিজে নিয়ে থাক। একজন আঙ্গুল তুললে চারিদিকে শত জনের আংগুল উঠে যাবে। আগের সব সন্দেহ এবার পূর্ণতা পাবে। বলেছিলাম না এই ছেলে গেছে?

এবার আমাকে বুঝান, আপনার সমাজের এতদিনের তথাকথিত ভালো ছেলেটা যদি ইসলামকে ধারণ করতে চায় তাহলে এত অবিশ্বাস কেন? এই ধর্ম কি রাসুলুল্লাহ (সা) এর সময়ের? আপনারর চেয়ে কি সে ইসলাম বেশী বোঝে না কম বোঝে? আপনার থেকে কোন জ্ঞান তার কম আছে? (আল্লাহ মাফ করুন)

এবার কিছু সহজ কথায় আসি। আমার নিজের কথা। গত এক বছরে আমার জীবনে আল্লাহর রহমতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আর এর পথটা কিছুতেই মসৃণ ছিল না।

আল্লাহ তাআলা অনেক আলেম, আল্লাহওয়ালা মানুষের সোহবতে এনেছেন। ইসলামের মুল ব্যাপারটা অন্তরে ধারণ করার তৌফিক দিয়েছেন। হয়ত আমলের ব্যাপারে, গুণাহের ব্যাপারে পা পিছলে যায় মাঝে মাঝে। কিন্তু এত এত ভ্রান্ত পথের মাঝে কুরআন সুন্নাহর কাছাকাছি একটা পথ দিয়েছেন। হয়ত পথের কেবল শুরুতে আছি।

গত একবছর ধরেই সন্দেহ আর অবিশ্বাস নিয়ে এগোচ্ছি। এখন পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা ভালো রেখেছেন। তবে ইলমের পথে, দ্বীনের ক্ষেত্রে যে বাধা বূযুর্গরা পেয়েছেন তার তুলনায় কিছুই না।

আল্লাহ তাআলা দ্বীনের যেটুকু বুঝ দিয়েছেন, সেটুকু মানার চেষ্টা করি। কিন্তু ঈমানের কমজোরির কারণে পারি না। পারি শুধু ফেসবুকে এসে বকবকাতে।

আশেপাশের মানুষ আগের তুলনায় অনেক বেশী সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায়। অনেকের দৃষ্টিতে আমি হলাম ভন্ড। অনেকের দৃষ্টি খুজে বেড়ায় আমার পিছনের দল বা গোষ্ঠী। এগুলো এলাকায় গিয়ে শুনি মাঝে মাঝেই।

একটা কথা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই, এই ছাব্বিশ বছরের জীবনে অনেক কিছু শিখেছি, দেখেছি, অনেক পরিবেশ পেয়েছি। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। এখন আল্লাহর রহমতে চাকুরী করছি, আর মাদ্রাসায় পড়ছি।

আজকের আমি আমার অতীতের পুরো শিক্ষাকে ধারণ করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। প্র্যাকটিক্যাল জ্ঞান কম হতে পারে, বুঝ আল্লাহ কম দেন নাই। এখনো বহু পথ বাকি। কিন্তু কাটা ছেড়া বাকা পথ শেষে যে রাজপথে আল্লাহর রহমতে উঠতে পেরেছি তা বুঝতে পারি। এগুলো গর্ব করার বিষয় না, শুকরিয়ার বিষয়। আলহামদুলিল্লাহ। এই পথে টিকে থাকব কিনা সেটা আল্লাহর অধীন।

তাই তোমাদের ট্যাগ দেয়া, সন্দেহ, অবিশ্বাসকে আমি গোণায় ধরি না। আমি যা ভাবি তা প্রকাশ করি, যা করি তাও প্রকাশ্যে করি। গোপনে কোন আইডিওলজি ধারণ করি না। কারণ আমার আইডিওলজি ১৪০০ বছর আগেই প্রকাশ হয়ে গেছে। অনেকেই এটা বোঝেন, কিন্তু বর্তমানের সাথে মিলাতে পারেন না। যার কারণে বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মাঝখানে পরে আছেন। কাফির হবার ভয়ে অবিশ্বাস করতেও পারছেন না, আবার বুঝের অভাবে বুঝতেও পারছেন না।

দ্বীনের পথে, ইলম অর্জনের পথে ইসলামের ভিতরে থেকে যতখানি ত্যাগ করা যায় তার জন্য প্রস্তুত আছি। আমি পিছনে ফিরে দেখি না। ওইটা আমার সাথে যায় না।

ভবিষ্যতের চিন্তা? সে তো আল্লাহর হাতে সঁপে দিয়েছি। ওইটা নিয়ে ভয় পাই না। অনেকের ধারণা তাহলে আল্লাহর উপর ভরসা করে হাত গুটিয়ে বসে থাকি? আমাকে যারা চেনেন তারা ভালো জানবেন।

সমাজে প্রচলিত কুপ্রথা, বিদআত দূর করতে যতটা আগ্রহী, ঈমান ও আকিদার তাগিদের ক্ষেত্রেও ততখানি। এই জজবা যেমন সবসময় থাকে না, তেমনি নিজের দুর্বলতার কারণে কাজেকর্মেও প্রকাশ পায় না।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দিন, এবং তার উপর অটল থাকার তৌফিক দিন। এর জন্য আসা যে কোন বিপদে ধৈর্য ধারণের তৌফিক দিন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হেদায়েত দিন।

অনেক কথা অহংকার এর মত লাগতে পারে। আল্লাহ মাফ করুন। আর আমার ভুলত্রুটিগুলোকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

#Islamophobiabd

#আলোর_পথে

পেশায় তড়িৎ প্রকৌশলী। মাঝে মাঝে কিছু লিখতে ইচ্ছা হয়। কিছু লিখি। তারপর আবার মুছে ফেলি। লেখা আর মুছে ফেলার মাঝে কিছু থেকে যায়। সেগুলোর জন্যই এখানে আসা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top