সেদিন সন্ধ্যায় সাতটার দিকে বাড়ি থেকে বের হলাম আমরা আমাদের এক অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে যাব বলে। আমার ইচ্ছা ছিল মাঝ রাস্তায় যে মসজিদটা আছে ওইটা তে জামাতে নামাজ পড়ার।
ফাঁকা রাস্তায় মসজিদটা দৃষ্টিগোচর হতেই দেখতে পেলাম মানুষজন নামাজে দাঁড়িয়ে গেছে। বাকীদেরকে পেছনে রেখে দ্রুত কদমে মসজিদের দরজার কাছাকাছি যেতেই নামাজ শেষ হয়ে গেল।
ফেরত চলে এসে বাকিদের সাথে হাঁটা শুরু করলাম আবার। এবার ইচ্ছা গন্তব্যস্থলের কাছে যে মসজিদ টা আছে ওখানে নামায পড়ে নিব। সে মসজিদে দরজার ঢুকতেই দেখি লোকজন নামাজে দাঁড়িয়ে গেছে। ইমামের জায়গাটা এখনও ফাঁকা। আমাকে দেখে নিজেরা জায়গা করে দিলেন ইমাম হওয়ার জন্য। আলহামদুলিল্লাহ। আগের জায়গায় জামাতে নামাজে পেলাম না আর এই জামাতে ইমাম হয়ে গেলাম। উনারা হুজুর দেখে জায়গা ছেড়ে দিয়েছেন।
হুজুর! এদেশে হুজুর ডাক শুনতে পারা খুবই সহজ কাজ। একটু দাড়ি টুপি পাঞ্জাবি পড়বেন তো আপনি হুজুর! কিন্তু একজন যুবকের জন্য হুজুর হয়ে যাওয়া বড় কঠিন কাজ। এতে যে পরিমাণ মানসিক শক্তি লাগে তার কারণে অনেকের উপলব্ধি আসা সত্ত্বেও কিছুদিন পরে ঝরে পড়ে যান। তবে পিছনে অন্যের মেহনত থাকলে কাজটা অনেক সহজ হয়ে যায়। আল্লাহ কার মাধ্যমে কাকে হিদায়াত দেন!
‘দাড়ি রেখেছো তোমাকে বিয়ে করবে কে?’
‘কি অবস্থা মুখে জঙ্গল বানিয়ে রেখেছ!’
‘জামাত শিবিরে যোগ দিছ নাকি’
ইত্যাদি নানান রকম কথা ভেসে আসে। কেউ সামনে বলে কেউ পিছনে আরেকজনকে বলে। ঠাট্টা বিদ্রুপ চলে।
মোটামুটি স্ট্যাবিলিটি আসার পরে এসব কিছু আর গায়ে লাগেনা। তখন পিছনে ফিরে মাঝের পরিবর্তনের সময়টার দিকে তাকালে দেখা যায় কত আলতু ফালতু জিনিস কি পরিমান মানসিক প্রেসার তৈরি করে দেয়। সমাজে আমাদের চলাফেরার যে ইমেজ আছে ওইটাকে বদলানোটাই আসলে চ্যালেঞ্জ।
যাইহোক, হুজুর হয়ে যাওয়া আসলে কোন যোগ্যতা না। সুন্নতি লেবাস ধারণের মাধ্যমে দ্বীন বুঝার কাছাকাছি চলে আসা। পরিবর্তনের ধোঁয়াশা কেটে যাওয়ার পরেই বোঝা যায় যে পথের একেবারে শুরুতে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর সাহাবীরা দূরে থাক, কাছাকাছি বুজুর্গদের সাথে ফারাক পর্বতসম। আর ফরজে আইন পরিমাণ ইলম অর্জন না করেও কিভাবে এত বছর কাটিয়ে দিলাম সেটা ভাবলে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
একসময় মাদ্রাসা বলতে আলিয়া মাদ্রাসা আর হাফেজী মাদ্রাসা বুঝতাম। আমাদের ওখানে কওমি মাদ্রাসা খুব কম। মাদ্রাসায় পড়েছেন মানে খুব বেশি হলে কোরআন শরীফ হিফজ করে কোন মসজিদের ইমামতি করা এটাই ছিল ধারণা।
সচিত্র নামাজ শিক্ষা, নেয়ামুল কোরআন, বাংলা অর্থ ও উচ্চারণসহ কুরআন, বারো চাঁদের ফজিলত, বুখারী, মুসলিম হাদিস এসব আমার পরিচিত সর্বসাকুল্যে ইসলামিক বইয়ের নাম। কোন প্রয়োজন হলে এগুলো খুলে খুলে দেখা আর কিছু দোয়া মুখস্থ করা এটাই ছিল প্রয়োজনীয় পরিমাণে ইলম এর সংজ্ঞা।
হায়! কি জাহেল অবস্থায় আমরা বড় হই। আমাদের নামাজ রোজা হজ এর মধ্যেই ইসলাম সীমাবদ্ধ।
এখন একেকজন আলেম হুজুরদের লেখা পড়ি, আর চিন্তা করি কোথায় আমাদের ইলম আর কোথায় তাদের ইলম, কোথায় আমাদের আমল আর কোথায় তাদের আমল। কত আগে তারা কি সুন্দর সুন্দর চিন্তা করে গেছে, নিজেরা দেখিয়ে গিয়েছেন। অথচ লোকজন তাদের মত মানুষের সাথে আমাদেরকেও হুজুর বলে। লজ্জায় মাটিতে ঢুকে যেতে ইচ্ছে করে।
আমাদের পেশাগত শিক্ষায় ফরজে আইন পরিমাণ ইলম শিক্ষা যদি থাকতো, তাহলে আমাদের এই দশা হতো না। বর্তমান একাডেমিক শিক্ষায় আমরা যে পরিমাণ সময় দেই তাতে আমাদের প্রচুর পরিমাণ সময় বেঁচে থাকে যেটা আমরা নষ্ট করি। আর উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত নিচের দিকে ক্লাসগুলোতে অর্থহীন প্রতিযোগিতা, অভিভাবকদের মূর্খতা আমাদের সময়গুলোকে খেয়ে দেয়। অথচ ফরজ পরিমাণ ইলম অর্জন এবং একাডেমিক পড়াশোনা চালানোর মত যথেষ্ট সময় পাওয়া যাবে যদি এসব বাড়তি চাপ না নেয়া হয়।
আমরা পেশাকেই জীবনের লক্ষ্য বানাই, সেটাকে লক্ষ্য করেই ছুটতে থাকি। মাঝখান দিয়ে সময় গুলো চলে যায়। অথচ পেশা জীবনের অবলম্বন মাত্র! লক্ষ্য তো হবে ইলম, লক্ষ্য হবে এই কাদায় ভরা সমাজের মধ্যেও যতখানি পারা যায় শরীরে কাদা এড়িয়ে যাওয়া, শুভ্রতা জারি রাখা। লক্ষ্য হবে হাজারো বাহ্যিক চাপেও মানসিক শান্তি, লক্ষ্য হবে ঈমান নিয়ে মৃত্যু।
হে আল্লাহ, তুমি আমাদেরকে হেদায়েত দান করো। আমাদের অন্ধকার গুলোকে আলোকিত করে দাও। যে অন্ধকার গুলো তুমি জানো, আর কেউ জানে না। হে আল্লাহ, যারা আমাদের উপরে ইহসান করেছে তাদেরকে তুমি ইহসান কর। আমিন।
February 15, 2021
জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি, লোকজন দৌড়াচ্ছে। কেউ বাড়ির সামনে থেকে, কেউ জমি থেকে। বাসের পিছনে তাকিয়ে দেখি, একজন সাইকেল আরোহী সাইকেলসহ পড়ে আছে। কোন নড়াচড়া নাই। কয়েক মুহুর্তের ব্যবধানে একটি মাইক্রোবাস তাকে চাপা দিয়ে গেছে।
কয়েকটা মুহুর্ত! কয়েক সেকেন্ডও বলা যায় না এই সময়টাকে। আচ্ছা এক সেকেন্ডের কত ভাগের একভাগ হলে তাকে মুহুর্ত বলে?
অল্প কিছু সময়ের ব্যবধান! এই মুহুর্তে হয়ত তাকে কেউ চিনছে না। আস্তে আস্তে পরিচয় বের হবে, আত্মীয়রা শোকে বিহবল হবে! হয়ত কয়েকবছরের ফুটফুটে ছেলেমেয়ে আছে তার, ঘরে বউ-বাবা-মা নিশ্চিন্ত মনে নিজেদের কাজ করছিল। একটু পরে খবর পৌছবে! জানাযা হবে, দাফন হবে, লোকজন ফিরে যাবে! অল্প কিছুদিন একটা শুন্যস্থান থাকবে, তারপর আস্তে আস্তে তা হারিয়ে যাবে কালের গহ্বরে।
অল্প কিছু মুহুর্ত! হয়ত কিছুক্ষণ আগে হাটে দরাদরি করেছে, হয়ত কাল কারো সাথে মনোমালিন্য হয়েছে, কিংবা আনন্দের কোন অনুভুতিও জন্মে থাকতে পারে! হয়ত তার সন্তানের কোন আবদার পুরণ করতে পারছিল না বলে মনটা পুরছিল, ভেবেছিল, ফুলকপির দামটা একটু বাড়ুক।
সামান্য সময়ের ব্যবধান, সে কি ভেবেছিল! হয়ত মৃত্যুর কথা ভেবেছিল, হয়তবা ষাট সত্তরের একটা রাফ হিসাব ধরে এগুচ্ছিল! জীবনটা গুছিয়ে নিতে হবে, বাচ্চাগুলোকে বিয়ে দিবে, তারপর নাতি – নাতনিদের সাথে খেলবে, তারপর দেখা যাবে! হায়! মৃত্যু তার হিসাবকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিল!
কতটুকুই বা সময়! অবুঝ থেকে বুঝবান হওয়া! একসময় জ্ঞানের কি বাহাদুরি আমাদের! চিন্তার কি তেলেসমাতি! ক্রিটিকাল থিংকিং! আস্তিকতা – নাস্তিকতা! কোথায় হারিয়ে যায় এসব!
সময় ছলনাময়ী, মৃত্যু নয়। আধুনিক চিকিৎসা দিয়ে মৃত্যুকে জয় করেছে মানুষ!!! কয় দিনের জয়?
আর কয়টা মুহুর্ত পাব আমরা! বিলাসিতার জীবনও শেষ হবে, অভাবেরটাও! সুখেরটাও, দুখেরটাও! গোছানো জীবনটাও শেষ হবে, অগোছালোটাও!
বুঝে উঠার আগেই হারিয়ে যাবে সময়গুলো, ফিরতে হবে আমাদের রবের দিকে!
ফেরার আগেই হোক ফেরা!