জীবনের হিসাব

জীবনের হিসাব

“এক বাও মেলে না। দো বাও মেলে—এ-এ না।”

দিন যায়। দিন শেষে হিসাব মিলানোর কথা। হিসাব মেলে না। গতদিনের হিসাব বাকি চলে যায়। সেটা ধরতে না ধরতেই আগামীকাল চলে আসে। আসে নতুন বছর।

ডিসেম্বর এলেই পত্রিকাগুলো সানন্দে আর্টিকেলের পর আর্টিকেল লিখতে থাকে। কেমন কাটল বছর? আমি বিরক্ত হই। একটা বছর চলে গেল তা নিয়ে এদের কোন আক্ষেপ নেই। আবার স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়াতে এই বছরে কি ঘটেছিল তার তেমন কিছুই মনে থাকে না। তাই বছর শেষে সারা বছরের রিভিউ পাওয়া যাবে বলে কিছুটা আগ্রহও থাকে। তাই অনেক সময় এই এক্সট্রা আর্টিকেল জড়ো করতাম। দিনদুনিয়ার খবর মিলানোর জন্য। নিজের স্মৃতি হাতড়াতে থাকি। এবার বুঝি মিলে যাবে। মিলে না।

বছরের পর বছর যায়। বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে একবিংশ শতাব্দীকে দেখছি। সেই ছোটবেলায় যখন ডিসেম্বরগুলো প্রায় একইরকম ছিল তখন আসলে সময়ের স্রোতটা বুঝা যেত না। একই স্কুল, একই শিক্ষক, ছাত্রছাত্রীও প্রায় আগের মত। মাঝে দিয়ে দুইএকজন নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হত। শুধুমাত্র শ্রেণীকক্ষ টা বদলে যেত। হাতে আসত নতুন বই। তখন সময় প্রায় একই রকম ছিল। সময়টা ঠিকই পার হয়ে যেত। হিসাব মেলানোর কথা মাথায় আসতো না। হিসাব মিলাতে হবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সেটা শেখায়নি।

এরপর কলেজ আসে, আসে ইউনিভার্সিটি। জীবনে আসে পরিবর্তন। শিক্ষাবর্ষগুলো ডিসেম্বরের টাইমফ্রেম থেকে বের হয়ে আসে। গতি দ্রুত হয়। জীবনের অর্থ নিয়ে ছোটাছুটি করি। একেকসময় একেক সংজ্ঞা দিতে থাকি। কখনো আধুনিকতার বাতাস, কখনও বা সাহিত্য। সংজ্ঞা মিলে না। সময় নিয়ে আক্ষেপ হয়। লোকেরা বলাবলি করে ‘লাইফ ওয়াজ দেয়ার।”

একবিংশ শতাব্দীর পাঁচ ভাগের এক ভাগ গত হয়েছে। হিসাবটা পুরোপুরি মেলে নি। তবে জীবনের সংজ্ঞা মিলেছে। জীবনের লক্ষ্য মিলেছে। মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলেছে। জীবনের স্টান্ডার্ড মিলেছে। একে ওকে অনুকরণ বা অনুসরণ করার প্রবণতা দুর হয়েছে। মিলেছে পারফেক্ট অনুকরণীয়, অনুসরনীয় ব্যক্তিত্ব। পথ মিলেছে। আল্লাহ মিলিয়েছেন। এ পথ বন্ধুর, পদে পদে হোঁচট খাবার ভয় এখানে। এ পথ বহুদুরের।

চারপাশের পরিবর্তন স্বাভাবিক। সময়ের স্রোত গতিশীল এ নিয়ে আফসোস করার কিছু নেই। জীবনের সুখ-দুঃখের আবর্তনেও হতাশ হবার কিছু নেই। আল্লাহ এ সবের পরিবর্তন ঘটান। শৈশব-কৈশোরের পরিবর্তন ঘটান। পরিচিত অনেক মুখ দুনিয়া থেকে গায়েব করে তার দিকে নিয়ে নেন। এটা জগতের নিয়ম – যা আল্লাহ বানিয়েছেন। এখানে হিসাব মেলাতে চাই আল্লাহর প্রতি তাওয়াককুল, দৃঢ় ঈমান, সবর, আর রাসুল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সাহাবীদের জীবনের অনুসরণ।

আলহামদুলিল্লাহ! অনেক কিছুর হিসাব মিলেছে। তবে নতুন অনেক প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। চারিদিকে জ্ঞানের এত উৎস থাকতেও আমরা অন্ধকারে কেন? আমাদের পরম আদর্শকে আমরা চিনি না কেন? মুসলিম হয়েও ইসলাম আমাদের কাছে কেন অপরিচিত? ইসলাম নামক সুন্দর ও শাশ্বত জীবনব্যবস্থা ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রজীবনে কেন অনুপস্থিত?

সময়ের স্রোত বহমান। প্রিয় ভাই, প্রিয় বোন, সময় ফুরোনোর আগে জীবনের হিসাবটা মিলবে তো?

পেশায় তড়িৎ প্রকৌশলী। মাঝে মাঝে কিছু লিখতে ইচ্ছা হয়। কিছু লিখি। তারপর আবার মুছে ফেলি। লেখা আর মুছে ফেলার মাঝে কিছু থেকে যায়। সেগুলোর জন্যই এখানে আসা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top