সময়, মেধা ও শ্রম

সময়, মেধা ও শ্রম

রুটি-রুজি – সময়, মেধা, শ্রম, আমি এবং আমরা – কিছু এলোমেলো কথা।

রুটি রুজির মালিক আল্লাহ! রিজিকের মালিক আল্লাহ! কার কোন রিজিক আছে সেটা আল্লাহ নির্দিষ্ট করে দেন। কাজেই আমার রিজিকে যেটা থাকবে সেটা আমি পাবই, তবে কথা হচ্ছে ওই রিজিক পাওয়ার পথটা হালাল হবে নাকি হারাম হবে। আমি যদি ধৈর্য হারা হই তাহলে যে কোনভাবেই হোক তা পাওয়ার চেষ্টা করব, সমাজে প্রচলিত মডিফাইড হারাম-হালাল, বিভিন্নভাবে অর্থ আদান-প্রদানের যে কালচার গুলো গড়ে উঠেছে তা বিবেচনায় আনবো। আর আমার ঈমান যদি একটু শক্তিশালী হয় তাহলে আমি আল্লাহর উপর ভরসা করে চেষ্টা করে যাবো।

চাকরি বাকরি, ব্যবসা, কৃষিকাজ ইত্যাদি পেশা দিয়ে যেমন কর্মসংস্থান গ্রহণ করা যায়, তেমনি চুরি-ডাকাতি, সুদ, ঘুষ ইত্যাদি দিয়েও টাকা পয়সা রোজগার করা যায়। পেশা বাছাইয়ের স্বাধীনতা আমাদের আছে। কিন্তু যখন প্রাক্টিক্যাল চিন্তা করতে যাই, তখন দেখা যায় সামাজিক অবস্থান, শিক্ষাদীক্ষা, সমাজের ধারণা ইত্যাদি কারণে আমাদের বাছাইয়ের জায়গাটা অনেক সংকীর্ণ হয়ে যায়। বেশিরভাগ সময় আমাদের পিতা মাতা, সমাজব্যবস্থা, ট্রেন্ড, আমরা কোন পেশা অবলম্বন করব, আমরা ভবিষ্যতে কি করতে চাই, আমার জীবন লক্ষ্য কি এসব নির্ধারণ করে দেয়। যার ফলে আমাদের সন্তুষ্টির যেমন বারোটা বাজে, তেমনি এই কৃত্রিম অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেও খুব কমই সফল হই।

আমাদের জীবন এর সময় গুলো বয়ে যায়। সময়ের স্রোতে আস্তে আস্তে আমরা শিক্ষিত হয়ে বেড়ে উঠি, কেউ কেউ অর্ধ শিক্ষিত বা অশিক্ষিত থেকে যায়। কেউ চাকরির পিছনে ছুটি, কেউ ছোটখাটো একটা ব্যবসা জোটানোর চেষ্টা করি, কেউ শ্রম বিক্রি চেষ্টা করি, লক্ষ্য একটাই যার যার অবস্থান থেকে একটা সম্মানজনক পেশা গ্রহণ করা। এই চেষ্টা গুলোর মধ্যে আমাদের প্রচুর সময় ব্যয় হয়। ব্যয় হয় মেধা, শ্রম।

যেহেতু চাকরির বাজারের খুব খারাপ অবস্থা, তাই অনেক সময় আমরা বিকল্প পথের ব্যবস্থা করি, টাকা পয়সা দিয়ে চাকরির চেষ্টা করি, কেউ বা রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের উপর ভরসা করি। এমন কি চাকরি-বাকরি পাওয়ার পরেও আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য আমরা আমাদের সময়গুলোকে আমাদের এই অবলম্বন গুলোর উপর ব্যয় করি। বেকারত্বের সময়টাতে একটি চাকরি জোটানোই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

সময়, মেধা, শ্রম জিনিসগুলোর আলাদা মূল্য আছে। এগুলোর একটা সীমাবদ্ধতা আছে। একখানে ব্যবহার করলে অন্য জায়গায় ব্যবহার করার সুযোগ কমে আসে। যে সময় আমি ফুটবল খেলতে পারি, সে সময় ক্রিকেট খেলার সম্ভাবনা কমে আসবে। অনেকেই মাল্টিটাস্কিং করেন, একই সময়ে একাধিক কাজ করতে পারেন কিন্তু আরো বেশি কোন কাজ করতে পারেন না। তাই অনেক সময় থেকে আমরা হতাশ হই যে তারা একসাথে অনেক কিছু করেন, আমরা পারিনা। হয়তো আল্লাহ তাদেরকে আমাদের থেকে শ্রম এবং মেধার সীমারেখা বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। কিন্তু সেও তার সক্ষমতা অনুযায়ী সময় বিভিন্ন জায়গায় ব্যয় করে থাকে, তাকে বাড়তি একটা কাজ দিলে সে আগের কাজগুলো থেকে সময় বাঁচিয়ে হয়তো করে দিতে পারবে।

আল্লাহ আমাদেরকে আলাদা ক্ষমতা দিয়েছেন। আমাদের চলার জন্য গাইডলাইন দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে আমাদের উদাসীনতার কারণে, ব্যাপক প্রতিযোগিতার কারণে পেশা বাছাইয়ের সময়, পড়াশোনা বা অন্য কোন কাজেই অন্যের অন্ধ অনুকরণ করি। এর অন্যতম কারণ আমাদের জীবনের লক্ষ্য না জানা, আমরা কোন জিনিস গুলোতে সময় দিতে পছন্দ করি, সেটা না জানা, টাকা পয়সার অভাব, সামাজিক চাপ।

আমি আমার স্বল্প জ্ঞানে যা বুঝি তা হলো আমাদের লক্ষ্যগুলো আপাত। আজ আমি যেটাকে আমার লক্ষ্য হিসেবে দেখছি, সেটা তে পৌছানোর পর আমার লক্ষ্যটা বদলে যায়। আরও বড় কিছু বা ভিন্ন কিছু করার ইচ্ছা হয়। আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য বলে কিছু নেই। আমাদের লক্ষ্য গুলো অনেক সংকীর্ণ। আমরা বেশিদূর তাকাতে পারিনা। তাকাতে পারলেও অনেক সময় স্থির থাকতে পারিনা। অনেক সময় অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকি ওরা কি করে।

আমরা প্রায়োরিটি লিস্ট সাজাতে পারি না। যার কারণে, যে কাজ করে আমার খুব অল্প কিছু লাভ হবে, সেখানে অনেক বেশি সময় ব্যয় করি, আবার অনিশ্চিত একটা সম্ভাবনায় অনর্থক সময় নষ্ট করি। উদাহরণস্বরূপ বছরের-পর-বছর রাজনীতি, সহমত ভাই এগুলো করা হয় ভবিষ্যতে কোন এক সময়ের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অথবা নিজের একটা চাকরির জন্য। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে আমাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতা। আমাদের জন্য কিছু করার মালিক তো আল্লাহ।আল্লাহ চাইলে ওই নেতার মাধ্যমে আমার কোন উপকার করাতে পারেন। বছরের পর বছর তাদের পিছনে সময় নষ্ট করার কিছু নেই। আল্লাহ যদি না চান তবে ওই নেতারা, ভাইয়েরা ওই সময়ে আমাদেরকে সুবিধা দেওয়ার বদলে নিজেরাই ইয়া নাফসি ইয়া নাফসি করতে থাকবেন।

ভবিষ্যতে কি হবে তা আমরা জানি না, তবে আশা করতে পারি। যে গুরুত্বপূর্ণ কাজটা করার জন্য আমি ৫ বছর পরে সময় ব্যয় করব বলে ভাবছি, সেই সময়টা আমি নাও পাইতে পারি। ওই সময় আমার হাতে ব্যস্ততা বেড়ে যেতে পারে অথবা আমি এই দুনিয়ায় নাও থাকতে পারি। কাজেই গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আগে আসবে, কম গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো কম গুরুত্ব পাবে। আমাদের চেষ্টা থাকবে, ধৈর্য থাকবে, আর ভরসা থাকবে আল্লাহর উপর, একমাত্র আল্লাহ।

তথাকথিত পেশা বা শিক্ষার জন্য আমাদের প্রয়োজনীয় পরিমাণ ইলম অর্জন করাও হয়ে ওঠে না। অথচ তা ফরজে আইন। একটা চাকরি জোটানোর জন্য হাজার হাজার ঘন্টা ব্যয় করতে পারি, একটা মাসআলা শিখতে কানা করি সময় ব্যয় করা হয়ে ওঠে না। এর কারণ এইটা আমাদের প্রায়োরিটি লিস্ট এ না থাকা। সেকুলার শিক্ষা আমাদের মনোজগতে এই বিষয়টাকে নাই করে দিয়েছে। খুব সফলভাবে আমাদের থেকে আল্লাহর উপর ভরসা, আখিরাতের চিন্তা বিস্মৃত করে দিয়েছে।

আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে আল্লাহর দিকে যাওয়া, জীবনে চূড়ান্ত লক্ষ্য হবে ঈমান নিয়ে মৃত্যু। এই উপলদ্ধি আনা, এর উপর টিকে থাকা কঠিন, সহজ না। এর জন্য প্রয়োজন ত্যাগ করার ইচ্ছা। মৃত্যু একটা পরম সত্য। কাজেই পেশা বাছাই বা শিক্ষা গ্রহণ এর সময় মৃত্যুচিন্তা না আনা, কিংবা পরকালে কি হবে তা না ভাবার যে সংকীর্ণ মনোভাব দূর করতে হবে।

কাজেই সময়, মেধা ব্যয় করার আগে অবশ্যই চূড়ান্ত লক্ষ্য, আপাত লক্ষ্য, নিজের প্রায়োরিটি লিস্ট, নিজের শিক্ষা, জীবনের অর্থ এগুলো নিয়ে ভাবতে হবে। সেটা শিক্ষার শুরুতে হোক, পেশার শুরু হোক অথবা জীবন চলার পথে যে কোন কাজেই হোক। প্রত্যেকটা সময় মূল্যবান। সামাজিক স্টেরিওটাইপের বাইরে গিয়ে এই চিন্তাভাবনা করা এবং সেই অনুযায়ী কাজ করা, কে কী ভাববে তা পায়ে ঠেলার জন্য শক্ত একটা ব্যাকআপ থাকতে হয়, একটা শক্ত বেজমেন্ট থাকতে হয়। আর আল্লাহর চেয়ে কে বেশি শক্তিবান ব্যাকআপ, কুরআন-সুন্নাহর চেয়ে আর শক্ত বেজমেন্ট কি বা হতে পারে?

আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর নিয়ামত – সময়, মেধা ও শ্রম এর সদ্ব্যবহার করার তৌফিক দান করুন। আমাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন। একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করার তৌফিক দান করুন।

পেশায় তড়িৎ প্রকৌশলী। মাঝে মাঝে কিছু লিখতে ইচ্ছা হয়। কিছু লিখি। তারপর আবার মুছে ফেলি। লেখা আর মুছে ফেলার মাঝে কিছু থেকে যায়। সেগুলোর জন্যই এখানে আসা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top