সবসময় সবকিছু সুশৃঙ্খলরুপে আমরা দেখতে চাই। সেটা আমাদের জীবন হোক কিংবা জীবনের কোন উপকরণ। অথবা হতে পারে শুধু অন্তরকে প্রশান্তকারী। যার কারণে আমরা আমাদের ঘরবাড়ি গুছিয়ে রাখি, বাগান সুন্দর করে বানানোর চেষ্টা করি, সন্তানদেরকে সুশিক্ষা দিতে চাই, সুন্দর চরিত্রের অধিকারী বানাতে চাই।
কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া আমরা যদি প্রত্যেক মানুষকে তার সামাজিক অবস্থান থেকে চিন্তা করি তবে বেশীরভাগ মানুষের জীবনে বেশীরভাগ সময় সুশৃঙ্খল – বিশৃঙ্খল দুটাই দেখতে পাব। এখানে ধনী ব্যাবসায়ীকে তার জীবনাচরণ দিয়ে, মধ্যবিত্তকে মধ্যবিত্ত, ভিক্ষুককে ভিক্ষুকের অবস্থান থেকে তার জীবনকে দেখতে হবে। অর্থাৎ এখানে তাদের জীবনযাপনের লেভেলের পরিবর্তন হতে পারে। এটা একটা অফসেট সংখ্যার মত যার মান বেশীরভাগ সময় কোন ব্যাক্তির জীবনের জন্য ধ্রুব, তবে অনেকের জন্য অনেক সময় এই লেভেল পরিবর্তনের সময় মান কিছুটা উঠানামা করে।
অন্যদিকে এই মানুষগুলোর এই জীবনাচরণে আমাদের উঠানামা দেখতে পাব। তবে এই উঠানামাটা সুষম না। কখনও জীবন অফসেটের উপরে, কখনো নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়।পৃথিবী সুষম না। কমলালেবুর মত। তাই অফসেট ঠিক রাখলে কাউকে দেখব জীবনের বেশীরভাগ সময় অফসেট লাইনের উপরে, অনেককে বেশীরভাগ সময় নিচে। তবে জীবনের সাথে সাথে অফসেট লাইনটাকেও যদি উঠানামা করাই তবে আমরা জীবনের এই উঠানামার পরিমান কমাতে পারব।
সোজা কথায়, মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ দুটোই আসে। কখনো দুঃখের পরিমাণ, জীবনের বিশৃঙ্খলতার বেশী হয়। সুন্দর বাগানও সবসময় সুন্দর থাকে না। কখনো ফুল থাকে, কখনো থাকে না। কখনো ঝড় এসে তছনছ করেও দিতে পারে। কিন্তু বাগানের স্ট্যান্ডার্ড যদি ফুলে ভরা বাগানে সেট করা থাকে, তবে যখন বাগানে ফুল থাকবে না, তছনছ অবস্থা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাগানের অবস্থা অফসেটের নিচে থাকবে। অন্যদিকে তছনছ অবস্থাকে অফসেট লেভেল ধরলে ফুল থাকার সময় বা না থাকার সময় উভয়ক্ষেত্রেই বাগান অফসেটের উপরে থাকবে।
—
জীবনের উঠানামা আমাদের হাতে নেই, তা আল্লাহর হাতে। আনন্দ-বেদনার উপলক্ষ আল্লাহর দেয়া। তবে সুখ-দুঃখ অনুভব আমাদের জীবনের বর্তমান অবস্থা এবং আমাদের সেটকৃত অফসেট লেভেলের উপর নির্ভর করবে।
<< ‘পূণ্যময় তিনি, যাঁর হাতে রাজত্ব, তিনি সবকিছুর উপর সর্বশক্তিমান। (তিনি হচ্ছেন আল্লাহ) যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যাতে করে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন, কে তোমাদের মাঝে আমলের দিক থেকে শ্রেষ্ঠ? তিনি হচ্ছেন পরাক্রমশালী, অত্যন্ত ক্ষমাশীল।’ [সুরা মুলক, ৬৭ : ১-২]>>
আল্লাহ যখন কোন নিয়ামত দেন, উন্নতি দেন, সুখ দেন তখন তিনি দেখেন বান্দা এই অবস্থায় তাকে ভুলে যায় কিনা। এটা তার জন্য এক পরীক্ষা। তাই আমাদের জীবনাচরণ যদি অফসেটের বেশী উপরে থাকে তবে সেটা আমাদের জন্য ভালো সংবাদ নয়। সেক্ষেত্রে আনন্দের আনন্দের আতিশয্যে আমাদের মনে আল্লাহর ভয় কমে যেতে পারে, অহংকার চলে আসতে পারে। তখন আমাদের অফসেট লেভেলটা টেনে উপরে উঠাতে হবে এই মনে করে যে আল্লাহ আমাদের এই পরিমাণ নিয়ামত দিয়েছেন, কাজেই আমাদের আরও বেশী সাবধান হয়ে চলতে হবে।
<<‘জেনে রেখো, তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। (এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে) তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে মহাপুরস্কার রয়েছে। (সুরা আনফাল, আয়াত : ২৮)>>
আবার বিপদের সময়, মুছিবতের সময় আল্লাহকে স্মরণ করা হয় এটা যেমন সত্য, তেমনি এই সময়টা ঈমানের জন্য, আমলের জন্য বড় ঝুঁকিপূর্ণ। দুঃখের আতিশয্য বাড়বে যদি অফসেট লেভেলের সাপেক্ষে আমাদের জীবনাচরণ বেশী নিচে থাকে। কাজেই এই সময় এই ভেবে সবর করতে হবে যে আল্লাহ আমাকে এখন এই অফসেট লেভেল দিয়েছেন, এটার জন্যই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করতে হবে। এটাই এই সময় আমাদের জীবনের সুশৃঙ্খলতার লেভেল।
সুহায়ব (রাযিঃ) থেকে বর্ণিতঃ:
রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ মু’মিনের অবস্থা বিস্ময়কর। সকল কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মু’মিন ছাড়া অন্য কেউ এ বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে না। তারা সুখ-শান্তি লাভ করলে শুকর-গুজার করে আর অস্বচ্ছলতা বা দু:খ-মুসীবাতে আক্রান্ত হলে সবর করে, প্রত্যেকটাই তার জন্য কল্যাণকর। সহিহ মুসলিম, হাদিস নং (ই.ফা. ৭২২৯, ই.সে. ৭২৮২)
কাজেই দুঃখ,বেদনা যেমন মুমিনের জন্য পরীক্ষা, তেমনি আনন্দও। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আমাদেরকে অফসেট লেভেল এমনভাবে উঠানামা করা দরকার যাতে বর্তমান অবস্থার সাথে এর পার্থক্য আমাদেরকে ধোঁকায় ফেলতে না পারে। এ কাজটা সহজ না। কারণ আমরা আমাদের লেভেল সেট করি আমাদের চেয়ে উপরের লেভেলের মানুষদের দিকে দেখে। পার্থিব জীবনের ভোগবিলাসের চাহিদা কমানো যেমন দুরূহ, তেমনি দুঃখ-বেদনাকে উপেক্ষা করাও। এ কাজ সম্ভব একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করে, আখিরাতের দিকে তাকিয়ে আর রসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবীদের জীবনযাপনের দিকে তাকিয়ে।