১।
আমরা সাধারণত জীবনে কঠোর শৃঙ্খলতা পছন্দ করি না। নিজের মত কাজ করতে পছন্দ করি। নিজের খেয়াল খুশিমত কাজ করলে হয়ত নিজে তৃপ্তি পাই, কিন্তু সবাই যখন এরকম করে তখন সামগ্রিকভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। যার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক কাজে গাইডলাইন খুঁজি। অবশ্য নিজেরাও নিজেদের পড়াশোনার জন্য বা ব্যাক্তিগত কাজেও টাকা দিয়ে হলেও গাইড খুঁজি, বড় ভাই খুঁজি, সফলতার জন্য।
প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন বিষয়ে গাইডলাইন বানানোর জন্য বর্তমানে পৃথিবীতে অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বিল্ডিং বানাতে বিল্ডিং কোড অনুসরণ করতে হয়। স্বাস্থ্যগত বিষয়ে হু এর দেয়া গাইডলাইন মেনে চলা হয়। অর্থনীতিতে বিশ্বব্যাংকের মত প্রতিষ্ঠান, রাজনীতিতে জাতিসংঘ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের রুলস মেনে চলা হয়। ইঞ্জিনিয়ারিং এর ক্ষেত্রে বিভিন্ন জিনিস বানানো, এমনকি খুব ছোট খাট টেস্ট করতেও আইইই, আইইসি প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের গাইডলাইন ফলো করতে হয়।
এই রুলস বা গাইডলাইনগুলাতে বেশীরভাগ সময় প্রধান প্রধান বিষয়ে যেমন সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকে, তেমনি কিছু বিষয়কে ঐচ্ছিক রাখা হয়, আর কিছু ছোট ছোট বিষয়ে অস্পষ্ট ধারণা থাকতে পারে। কোন প্রতিষ্ঠান যদি কোয়ালিটি পূর্ণ কাজ করতে চায় তবে তাদের উচিত এদের নির্দেশনা অনুসরণ করে কাজ করা। অনেকে সময় এ কাজ গুলোর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য সারটিফিকেশন চাওয়া হয়। যারা সুস্পষ্ট বিষয়ে নির্দেশনা মেনে চলে তাদেরকে দেয়া হয় “Complied with অমুক guideline”.
এই নির্দেশনা গুলো দেয়া হয় কাজকে সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য। অনেক প্রতিষ্ঠান কিছু নির্দেশনা মানে, কিছু মানে না। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান গাইডলাইনের ধার ধারে না, যাচ্ছেতাই কাজ করে। যার ফলে কাজের কোয়ালিটি কমে যায়। তবে সময়ের সাথে গাইডলাইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দেশনায় পরিবর্তন আনে। এটা করার অথোরিটি তাদের আছে।
২।
আমরা জীবনে কিভাবে চলব, কিভাবে আচরণ করব, সমাজে কিভাবে বাস করব সেক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টা করি। অনেক সময় সামাজিক মূল্যবোধ নামক অলিখিত রুলস থাকে। সেগুলা একেক সমাজে একেক রকম। কাজেই পৃথিবীতে মানুষের বিভিন্ন রকম জীবনযাপনের ধরণ দেখতে পাওয়া যায়।
আমাদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ। তিনি মানুষের বিষয়ে সব কিছু জানেন। কোনটিতে তার ভালো, কোনটিতে মন্দ – তা আমাদের থেকে বেশী জানেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
<<তোমরা যা অপছন্দ কর হতে পারে তা তোমাদের জন্যে কল্যাণকর এবং যা তোমরা ভালোবাস সম্ভবত তা তোমাদের জন্যে অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন আর তোমরা জান না।>> -সূরা বাকারা (২) : ২১৬
মানুষ যেন উত্তমরূপে জীবন-যাপন করে তার জন্য তিনি যুগে যুগে রাসুল পাঠিয়েছেন। আসমানি কিতাব দিয়েছেন। মানুষের জীবনযাপনের জন্য নিয়মকানুন রূপে শরীয়াহ প্রদান করেছেন। অবশ্য অনেক সময় তা নির্দিষ্ট কিছু জাতির জন্য ছিল। আল্লাহ তাআলা সমগ্র মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম গাইডলাইন হিসেবে আল-কুরআন দিয়েছেন। কিভাবে এতে বর্ণিত নির্দেশনা মানতে হবে তার জন্য মুহাম্মাদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাঠিয়েছেন। তাকে দিয়ে মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন। তো এই জীবনযাপনের নির্দেশনা আইনকানুনই শরীয়াহ নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে ইসলামকে একমাত্র গ্রহণযোগ্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করেছেন এবং আগের সব শরীয়াহ রহিত গেছে।
<<আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামতও পূর্ণ করলাম। আর দ্বীন হিসাবে ইসলামকে তোমাদের জন্য মনোনীত করলাম।>> -সূরা মাইদা ৫:৩
আল্লাহ ইসলামের যে গাইডলাইন নির্ধারণ করে দিয়েছেন তা মানলে আমাদের জীবন হবে সর্বোত্তম। আর আমরা কিছু মেনে কিছু না মেনে চললে বা কোন নির্দেশনাই না মানলে এতে আমাদেরই ক্ষতি। তাতে এই গাইডলাইন এর পরিবর্তন হচ্ছে না। নবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মৃত্যুর মাধ্যমে আল্লাহ এই গাইডলাইনের পরিবর্তন রুদ্ধ করে দিয়েছেন। কাজেই আমাদের জীবনের প্রয়োজনে বা যুগের প্রয়োজনে এই গাইডলাইন এর পরিবর্তন ঘটার সুযোগ নেই, বরং গাইডলাইন এর সাথে কমপ্লাই করার জন্য জীবন বা যুগে পরিবর্তন আসতে পারে।
তো এই ইসলামিক গাইডলাইনে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক জীবন প্রভৃতির প্রধান বিষয় যেমন – ঈমান, নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত, বিয়ে, লেনদেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, হালাল-হারাম, জিহাদ প্রভৃতির প্রধান নিয়মকানুনগুলো পরিস্কার করা আছে। সূক্ষ্ম কিছু বিষয়ে মতভেদ আছে। আমরা যদি প্রধান বিষয় গুলোর নির্দেশনা মেনে চলি আর মতভেদপূর্ণ বিষয় গুলা নিয়ে আলেমদের অনুসরণ করি তাহলে আমাদের জীবন দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গায় সর্বোত্তম হবে।
আমরা যেন ইসলামিক গাইডলাইনের যত কাছে যাওয়া যায়, তত কাছে যাওয়ার চেষ্টা করি। যাতে মৃত্যুর সময় কেউ সার্টিফাই করতে পারে “Complied with Islamic guideline”.