আমি যা দেখি তুমি কি তা দেখ?

আমি যা দেখি তুমি কি তা দেখ?

“আমি যা দেখি তুমি কি তা দেখ?”

সাধারণভাবে আমরা কেউ কারো মত দেখি না। একই জিনিস আমি যা দেখি, আরেকজন তার থেকে একটু হলেও ভিন্নভাবে দেখে। আমাদের আছে দেখার ভিন্নতা, ভাবার ভিন্নতা। আল্লাহর সৃষ্টি – বিচিত্র পৃথিবী, বিচিত্র মানুষ।

আমরা সফলতাকে বিভিন্নভাবে দেখি, ব্যর্থতাকে বিচিত্রভাবে দেখি, যেমন বিভিন্নভাবে উপলব্ধি করি জীবনকে। যুগের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে ভাবতে শিখি। স্রোতে গা এলিয়ে দিই।

তবে ইদানীং আমরা অনেক মানুষ প্রায় কাছাকাছি থেকে সফলতা – ব্যর্থতাকে দেখি। আমাদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে – এগিয়ে যেতে হবে। নিজে স্বপ্ন দেখি, আরেকজনকে দেখাই।

তবে এই স্বপ্ন দেখানো, সফলতার দিকে উৎসাহ দেখানোতে আমরা ইনসাফ দেখাই না। যে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে তাকে প্রথম হওয়ার স্বপ্ন দেখাই, যে পিছিয়ে তাকে অন্তত তার জায়গা থেকে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেই। যে এবার ব্যর্থ তাকে সামনেরবার সফল হবার স্বপ্ন দেখাই। স্কুলের শিক্ষার্থীকে ভালো কলেজের স্বপ্ন দেখাই, কলেজের শিক্ষার্থীকে দেখাই ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের, পাশ করতে ভালো চাকরির নেয়ার দিকে ঠেলে দেই। যে জীবনযাপন করার মত চাকরি পায় সে দেখে আরও বড় কিছুর স্বপ্ন। ফলে সফলতার মরীচিকা অধরাই থেকে যায়, না থাকে অন্তরের শান্তি, না করি নিজের প্রতি ইনসাফ।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে।” (সূরা আত-তাকাসূর, আয়াত : ১)

অথচ আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত ছিল আজ আমরা যেভাবে সফলতাকে দেখি তার প্রায় উল্টো। আমাদের সফলতার সংজ্ঞা স্থির না। অথচ আল্লাহ সফলতার সংজ্ঞা দিয়েছেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন, “সেই সফলকাম হয়েছে যে নিজেকে শুদ্ধ করেছে, সেই ব্যর্থ হয়েছে যে নিজেকে কলুষিত করেছে”। (সূরাহ আশ-শামস, আয়াত : ৮-১০)

“আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা দরকার যারা মানুষকে ভালোর দিকে আহবান করে এবং সৎ কাজের আদেশ করতে থাকে ও অসৎ কাজ হতে নিষেধ করতে থাকে, আর এরাই হবে সফলকাম”। (সূরাহ আল ইমরান, আয়াত :১০৪)

আজ আমাদের ঈমান দুর্বল। আমরা যখন আলোচনা করি তখন প্রকৃত সফলতা নিয়ে আলোচনা করি না। করি দুনিয়াবী সফলতার আলোচনা যার মধ্যে বিন্দুমাত্র ইনসাফ নেই। আমাদের তাকওয়া বড় দুর্বল। আমাদের আলোচনায় প্রকৃত সফলতার আলোচনা থাকে না। আমরা যখন অর্থ উপার্জনের সফলতা দেখি, তার মধ্যে হারাম-হালালের সূক্ষ্ম কেন মোটা ফারাকও দেখতে পাই না। আমরা যখন ক্ষমতা দেখি তখন সেখানে ইনসাফ দেখতে পাই না, জুলম দেখতে পাই না।

“যেসব লোক শুধু এই পৃথিবীর জীবন এবং এর চাকচিক্যের অনুসন্ধানী হয়, তাদের কাজ-কর্মের যাবতীয় ফল আমি এখানেই তাদেরকে দান করি আর সেক্ষেত্রে তাদের প্রতি কোনরূপ কম করা হয় না। কিন্তু পরকালে তাদের জন্য আগুন ব্যতীত আর কিছুই নেই। (সেখানে তারা জানতে পারবে যে) তারা পৃথিবীতে যা কিছুই বানিয়েছে, তা সবই বিলীন হয়ে গিয়েছে এবং তাদের যাবতীয় কৃতকর্ম সম্পূর্ণরূপে নিষ্ফল হয়েছে”। (সূরা হূদ, আয়াত : ১৫-১৬)

এইযে আমরা ভিন্ন ভিন্নভাবে মেকি সফলতাকে দেখছি, আলোচনা করছি, একে অপরকে উৎসাহ দিচ্ছি, তা কতদিন স্থায়ী হবে তা আমাদের চোখে আসছে না। আমরা আজ সাধ্যের বাইরে গিয়ে মরীচিকার পিছনে ছুটছি। অথচ আল্লাহ আমাদের চিরস্থায়ী যে সফলতা দিবেন, সেখানে তিনি ইনসাফ করবেন। তিনি সবাইকে সাধ্য অনুযায়ী দায়িত্ব দিয়েছেন। গরীব, ধনী, নারী, পুরুষ প্রত্যেকে তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করলে আল্লাহ তাদের সবাইকে আখিরাতে সফলতা দান করবেন ইনশাআল্লাহ।

চাইলেই আমরা আমাদের দেখাগুলো এক করে ফেলতে পারি। চোখে হারাম-হালালের ফিল্টার লাগিয়ে, অন্তরে তাকওয়ার ফিল্টার লাগিয়ে, কর্মগুলোকে আল্লাহর দেওয়া দ্বীন অনুযায়ী পরিচালনা করে ।

رَبَّنَا آتِنَا فِيْ الدُّنْيَا حَسَنَةً وَّفِيْ الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ

হে আমাদের রব, আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দিন। আর আখিরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদেরকে আগুনের আযাব থেকে রক্ষা করুন।

আমার এই লেখার প্রথম উক্তিটি হওয়া উচিত ছিল –

“রসুল (স) যেভাবে দেখেছেন, সেভাবে কি আমরা দেখার চেষ্টা করি?”

পেশায় তড়িৎ প্রকৌশলী। মাঝে মাঝে কিছু লিখতে ইচ্ছা হয়। কিছু লিখি। তারপর আবার মুছে ফেলি। লেখা আর মুছে ফেলার মাঝে কিছু থেকে যায়। সেগুলোর জন্যই এখানে আসা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top