আল্লাহ আমাদের যে দুটি চোখ দিয়েছেন তাই দিয়ে আমরা দেখি। কত সুন্দরভাবেই না আমাদের চারপাশের পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। বিচিত্র প্রাণী – উদ্ভিদ – নির্জীব বস্তু। কত সুন্দর প্রকৃতি। দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। আলহামদুলিল্লাহ!
আমরা যখন কোন কিছু দেখি তখন সেই দৃশ্য কতটুকু উপভোগ্য হবে তা অবশ্যই ওই জায়গার উপাদানগুলোর উপর নির্ভর করে। তবে এর অনেকখানি নির্ভর করে আমি কোন জায়গা থেকে দৃশ্যটাকে দেখছি। এক কোনা থেকে একরকম, তার বিপরীত কোনা থেকে দেখলে অন্যরকম, আবার উপর থেকে দেখলে একেবারেই অন্যরকম লাগতে পারে। একজন দক্ষ ক্যামেরাম্যান সবচেয়ে উপযোগী জায়গাটা খুঁজে বের করে ছবি তোলেন। সে কারণেই তার তোলা ছবি দেখলে মন জুড়িয়ে যায়, আমরা বাহবা দেই।
আমাদের জীবনের ক্ষেত্রেও এমনই। আমরা বিচিত্র মানুষ বিচিত্রভাবে জীবনকে দেখি। জীবনকে উপলদ্ধি করার চেষ্টা করি। অর্থ খুঁজে বেড়াই, কিভাবে এই জীবন অতিবাহিত করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলব সেই পথ খুঁজি। জীবনে চলার পথেই একে অন্যের দিকে আঙুল তুলে তার জায়গাটা সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করি।
একজন ধনী ব্যক্তি গরীব ব্যক্তির দিকে আঙুল তুলে বলে ঈশ কত কষ্টে আছে। গরীব যে সে ধনীর জীবনে সুখ খুঁজে পায়। হতে পারে গরীব ব্যক্তিটি আসলেই কষ্টে আছে, ধনী ব্যক্তিটি আসলেই সুখে আছে। তবে যদি আমি মানসিক শান্তি – প্রকৃত সুখ এসব ব্যাপার খুঁজে দেখি তবে চিত্রটা এর উলটাও হতে পারে। একজন যদি আরেকজনের যায়গায় গিয়ে তার মত করে চিন্তা করত তবে হয়ত প্রকৃত চিত্র দেখতে পেত।
ধরি আমরা চারদিকে বিশাল পাহাড় বেষ্টিত মোটামুটি এবরোথেবরো জায়গায় বাস করি। পাহাড়ের অন্য পাশে জমিগুলো বসবাসের জন্য কেমন তা জানতে হলে আমাকে অন্তত পাহাড়ের চুড়ায় উঠতে হবে – সবচেয়ে ভালো হয় যদি ওইপাশে গিয়ে কিছুদিন বাস করে আসি। যদি পাহাড় অতিক্রম করার কাজটা একটু কষ্টসাধ্য ও ত্যাগ-তিতিক্ষা যুক্ত হয় তবে আমাদের বেশীরভাগ মানুষই তা করতে চাইবে না। যাক না জীবন যাচ্ছে যেমন।
—
একটু কঠিন একটা বিষয় বলি। চাইলে এই প্যারাটা বাদ দিয়েও পড়তে পারেন। রসায়নে সক্রিয়ন শক্তির একটা ধারণা আছে। সহজভাবে জিনিসটা এরকম – প্রত্যেক পদার্থের ভিতরে এক ধরণের শক্তি থাকে। এই শক্তি একেক পদার্থে একেক রকম। রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে এ ধরণের এক বা একাধিক পদার্থের বিক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন শক্তিবিশিষ্ট পদার্থ তৈরি হয়। নতুন পদার্থের শক্তি পুরাতন পদার্থের শক্তি অপেক্ষা বেশী হোক বা কম হোক এই পরিবর্তন সহজ নয়। এই পরিবর্তন ঘটতে হলে পুরাতন পদার্থগুলোকে একটা শক্তির পাহাড় অতিক্রম করতে হয়। এই শক্তির পাহাড়ের উচ্চতাকে সক্রিয়ন শক্তি বলে। চাইলে প্রভাবক ব্যবহার করে শক্তির এই পাহাড় কমানো যায়। কিন্তু প্রভাবক কখনই বিক্রিয়া ঘটাতে পারে না – শুধু পারে শক্তির পাহাড় সহজ বা কঠিন করতে।
—
আমরা সাধারণত মোটামুটি বিশৃঙ্খলভাবে ( কারো ক্ষেত্রে বেশী কারো ক্ষেত্রে কম ) জীবনযাপন করি। যারা নিজেদেরকে শৃঙ্খলায় আবদ্ধ করে তাদেরকে এলিয়েন মনে হয়। যাচ্ছেতাই ভাবে জীবন যাপন করা কারো কাছে দ্বীনের আলোয় জীবনযাপন করা ব্যক্তিকে দেখলে মনে হয় কত কষ্ট হচ্ছে তার। অথচ সে নিশ্চিত জানে দ্বীন মেনে চলা ব্যক্তির মানসিক শান্তির ধারে কাছেও সে নাই।
কিন্তু তার দৃষ্টিতে তা কষ্টের জীবন হওয়ায় সে সাহস পায় না বা ইচ্ছা করে না। কিন্তু কেউ যদি মোটামুটি সাহস করে তার মাঝের এই পাহাড় ডিঙ্গায়ে যেতে পারে তবেই সে প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধি করতে পারবে। এক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকায় মানুষ, বই প্রভৃতি অনেক কিছুই কাজ করতে পারে। তবে এক্ষেত্রে খেয়াল করতে হবে যে প্রভাবক কখনই পরিবর্তন ঘটাতে পারে না, সহজ করতে পারে, তাই ব্যক্তির ইচ্ছাই মুল ভূমিকা পালন করতে পারে।
মানুষ জড় পদার্থ না, মানুষ মানুষই। তাই পদার্থের পরিবর্তনের সাথে মানুষের পরিবর্তনের অমিল আছে। রাসায়নিক পরিবর্তন বাস্তবক্ষেত্রে বেশীরভাগ সময় একমুখী। তাই একবার পাহাড় ডিংগালেই হল। মানুষের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এত সহজ না, বরং অনেক গতিশীল। একবার পাহাড় ডিংগানোর পর অসতর্কতার কারণে উল্টাদিকে পিছলে আগের জায়গায় এমনকি আগের থেকে গভীর খাদেও পড়ে যেতে পারে। কারণ বেশীরভাগ ক্ষেত্রে উলটা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে পাহাড়ের উচ্চতা অনেক কমে যেতে পারে।
সারকথা এই যে, প্রকৃত মানসিক শান্তি অর্জনের জন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির অবস্থানের পরিবর্তন ঘটাতে হবে, চারদিকে পথ খুঁজতে হবে, পথ খুঁজে পেলে একটু কষ্ট করে পরিবর্তনের পাহাড় অতিক্রম করতে হবে। এবং একবার অপরপাশে পৌঁছালে সতর্ক থাকতে হবে যেন পা পিছলে না যায়।
সর্বাবস্থায় আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ চাইলে আমাদের চলার পথ সহজ করে দিবেন।
যা দেখি তা তা না, সব দেখা দেখা না। আমাদের জীবনের পরিবর্তনগুলো হোক পজেটিভ এবং একমুখী।