চরিত্র ও সংখ্যারেখা

চরিত্র ও সংখ্যারেখা

একটা শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে তখন সে থাকে নিষ্পাপ। সে না কারও সাথে মিথ্যা কথা বলতে পারে, না কারো সাথে প্রতারণা করতে পারে। আবার কথা দিয়ে কথা না রাখা, কাউকে গালমন্দ করা এগুলোর প্রশ্নই আসে না। তার চরিত্র থাকে নিষ্কলুষ।

সময়ের সাথে সে কথা বলতে শিখে, হাঁটতে শিখে, বুঝতে শিখে। শিখে কিভাবে অন্যের সাথে কথা বলতে হয়, নিজের প্রয়োজনগুলো মিটাতে কিভাবে কমিউনিকেট করতে হয়। এগুলোর সবই শেখে তার চারপাশের মানুষগুলোকে দেখে।

আরেকটু বড় হলে শিখে কিভাবে অন্যের উপরে নিজেকে প্রাধান্য দিতে হয়। কিভাবে সামাজিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে হয়। এক্ষেত্রে এসে তার মধ্যে কলুষিত জিনিসগুলো ঢুকতে শুরু করে। পিতামাতা যদি এই সময় তার সুশিক্ষা দিতে পারে বা তার মধ্যে বিবেকবোধ জাগিয়ে দিতে পারে তবে তা কিছুটা এই কলুষিত শিক্ষার এন্টিবডি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু সামাজিক প্রেক্ষাপটের কারণে তা খুব কম পরিমাণে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারে।

আমরা চরিত্র শব্দটার দ্বারা বেশ কিছু জিনিস বুঝাই। যেমন – কেউ সাধারণভাবে সত্যবাদী নাকি মিথ্যাবাদী, কথা দিয়ে কথা রাখে কিনা, সুদ-ঘুষ খায় কিনা ইত্যাদি। তবে বেশীরভাগ সময় ‘চরিত্র খারাপ’ শব্দদ্বয় তখনই কারো প্রতি লাগিয়ে দেই যখন সে এক বা একাধিক নারী বা পুরুষের সাথে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক রাখে কিংবা নেশা করে ।

আমাদের এই চারিত্রিক সংজ্ঞাটা অনেক রক্ষণশীল। ছোটখাট মিথ্যা বলা, টুকটাক পরনিন্দা করা, হালকা পাতলা গালাগালি করা এই টাইপের জিনিসগুলো এর আওতায় আসে না। গীবত (কারো অনুপস্থিতিতে তার নিন্দা করা) করাকে তো গোনায়ই ধরা হয় না।

এই ক্ষেত্রে আখলাক শব্দটা অনেক সফল ও ব্যাপকভাবে কারো চারিত্রিক বিবরণ ধারণ করে। মানুষের বিনয়, নম্রতা, সহনশীলতা থেকে শুরু করে সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, ন্যায়পরায়ণতা, ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সততা প্রভৃতির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রূপকে তা ধারণ করে। আবার নেগেটিভ দিকে মিথ্যা, গীবত, কৃপণতা, হিংসা থেকে শুরু করে নেশা, ব্যাভিচার এর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যাপারগুলোকে ধারণ করে।

আমাদের সমাজব্যবস্থার তুলনামূলক ভালো চরিত্রের মানুষকেও যদি এসব ব্যাপারে পয়েন্ট দেয়া যায় তাহলে দেখা যাবে প্রতিদিন তার ঝুলিতে প্রচুর পরিমাণে নেগেটিভ পয়েন্ট জমা হচ্ছে। ধরলাম সততার ক্ষেত্রে প্রতিদিন গড়ে -৫, গীবতের ক্ষেত্রে -১০ পয়েন্ট করে পাচ্ছে। তাহলে ২৫ বছরের জীবনে প্রথম ৫ বছর বাদ দিলে সে সততায় পাচ্ছে -5 x 20 x 365 = -36,500 পয়েন্ট এবং গীবতের ক্ষেত্রে -10 x 20 x 365 = -73,000 পয়েন্ট। এভাবে আখলাকের প্রতিটি বিষয়ে পয়েন্টের একটা ধারণা নেয়া যায়।

এখন যদি এই পয়েন্ট গুলোকে আমরা সংখ্যারেখায় স্থাপন করি তাহলে আজ সততার সংখ্যারেখায় তার অবস্থান নেগেটিভ দিকে -৩৬,৫০০, গীবতের সংখ্যারেখায় তা -৭৩,০০০। যারা সংখ্যারেখা ব্যপারটা বোঝেন না তাদের বলি – সংখ্যারেখা হল একটা রেখায় মাঝে শূন্যকে রেখে ১,২,৩ ইত্যাদিকে ডানদিকে এক এক করে বাড়িয়ে অসীমের দিকে যাওয়া আবার বামদিকে একইভাবে -১, -২, -৩ এভাবে নেগেটিভ অসীমের দিকে যাওয়া।

এখন তাহলে একটা শিশুর অবস্থান শুন্যরেখা অর্থাৎ মধ্যবিন্দুতে। আর সমাজের তুলনামূলক ভালো চরিত্রের মানুষটা আখলাকের সংখ্যারেখায় নেগেটিভ দিকে এতদূর চলে গেছে। প্রতিদিন তার নেগেটিভ পয়েন্ট যোগ হলে তা নেগেটিভ অসীমের দিকে সরে যাচ্ছে।

আমাদের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হল নেগেটিভ পয়েন্ট অর্জন করা। তাহলে পজেটিভ পয়েন্ট অর্জনের উপায় কি! আবার এই যে এতগুলা নেগেটিভ পয়েন্ট, এগুলোকে ঠেলে পজেটিভ দিকে যাওয়ারই বা উপায় কি! উপায় হল প্রতিদিন পজেটিভ পয়েন্ট অর্জন করা। নিজের প্রবৃত্তিকে বশে আনার এই কাজ অতীতে অনেকেই করে গেছেন। কাজেই ইনশাআল্লাহ আমরাও পারব।

আচ্ছা ঠিক আছে, প্রতিদিন ১ বা ২ পজেটিভ পয়েন্ট পাইলেও তো মনে হচ্ছে নেগেটিভ পয়েন্ট নিয়েই মারা যাওয়া লাগবে। এর সমাধান একটাই। আল্লাহর কাছে দোয়া করা, ইস্তিগফার করা, নিজের অতীত ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। সামনে এরকম ভুল না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করা। আল্লাহ চাইলে এক ধাক্কায় আপনাকে যেমন শুন্যরেখায় পৌছিয়ে দিতে পারেন তেমনি পারে সমপরিমাণ বা তার থেকেও অনেক বেশীী পজেটিভ পয়েন্ট দিতে।

আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মত মানুষ প্রতিদিন আল্লাহর কাছে একশত বার ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। সেখানে আমরা কেন পারব না?

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ক্ষমা করুন এবং সবাইকে হেদায়েত দিন। মৃত্যুর পূর্বেই সবার অবস্থান হোক শুন্যরেখার ডানদিকে।

পেশায় তড়িৎ প্রকৌশলী। মাঝে মাঝে কিছু লিখতে ইচ্ছা হয়। কিছু লিখি। তারপর আবার মুছে ফেলি। লেখা আর মুছে ফেলার মাঝে কিছু থেকে যায়। সেগুলোর জন্যই এখানে আসা।
Website

2 thoughts on “চরিত্র ও সংখ্যারেখা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top