কোয়ারেন্টাইনের দিনগুলি-১

কোয়ারেন্টাইনের দিনগুলি-১

করোনাকাল চলছে। কালের শুরুতে আছি নাকি মাঝে আছি আপাতত বুঝতে পারছি না। আল্লাহ রব্বুল আ’লামিন এর কাছে শুকরিয়া যে তিনি এখন পর্যন্ত আমাকে যেমন সুস্থ রেখেছেন তেমনি পরিচিত কারো এখন পর্যন্ত করোনা হওয়ার খবর শুনি নি। আলহামদুলিল্লাহ।

করোনা আসার কারণে এমনিতে অফিসের কাজে কিছুটা ঢিলে ভাব চলে এসেছিল। তার উপর রমজান মাসের সুবাদে অফিসের কাজের বাইরে বাকি সময়টা একটা স্ট্রাকচারড অবস্থায় চলে আসে। তার উপর বেশ কয়েক মাসে অনেকটা থিতু হয়ে গেছি এখানে।

করোনা স্থবিরতার শুরু থেকেই জীবনবোধ আর দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারগুলো নিয়ে একটা ভাবনাচিন্তা চলে আসে। চারপাশ, নিজের জীবন, সফলতা প্রভৃতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে ইচ্ছা করে। সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া নিজের পঁচিশ বছর পূর্ণ হলে এই ভাবনাগুলোকে সুশৃঙ্খল করার একটা চেষ্টা প্রকট হয়ে ওঠা স্বাভাবিক।

আমি আত্মকেন্দ্রিক মানুষ। অন্যের চেয়ে নিজের চিন্তায় বেশী অস্থির হয়ে উঠি। তাই ভাবলাম করোনার সুবাদে যেহেতু একটু অবসর নেমে এসেছে, সেহেতু পিছনে ফেলে আসা পঁচিশ বছরের পর্যালোচনা করি। এরকম কাজ আগেও করেছি। তারপর নিজের জন্য যে কর্মপরিকল্পনা নিয়েছিলাম সেগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, একাডেমিক জীবন, দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততায় হারিয়ে গেছে। তবে এবার করোনার সুবাদে হোক বা নিজের চাকরির সুবাদেই হোক আল্লাহর রহমতে অনেক দিনের ইচ্ছার একটা প্রতিফলন আনার চেষ্টা করছি।

কুরআন পড়া শিখেছিলাম ছোটবেলায়। তারপর এসএসসির পরে একবার ঝালাই করে নেয়ার চেষ্টা করি বাড়ির কাছাকাছি একটা মাদ্রাসায় গিয়ে। অর্থসহ পড়ার ইচ্ছা অনেকদিনের। তাই এত বছর পরে @Ehsan ভাইয়ের সহযোগিতায় নতুন করে কাজ শুরু হয়।

রোজা আসার আগে পড়াটা মোটামুটি আয়ত্তে আসে। রোজা অফিসের কাজের বাইরের সময়টা ব্যবহারের সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। প্রতিদিন কিছু আয়াত অর্থসহ পড়া হয় মসজিদে। নিজে কিছু আয়াত অর্থসহ মুখস্থের চেষ্টা করি রাতে। মাসালা-মাসায়েলের চর্চা হয়। রসুল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনীর প্রায় দুই তৃতীয়াংশ শেষ। যদিও সেটা প্রায় থমকে গেছে এখন।

আমরা সবসময় একটা রেসের মধ্যে থাকি। সময়ের স্রোতের সাথে রেস। সবসময় সামনে কিছু না কিছু থাকে। করোনাভাইরাসের এই সময়টাকে আমার কাছে একটা পিট স্টপ এর মত মনে হয়। এক অখণ্ড অবসরে নিজেকে নিয়ে ভাবা। আমরা নিজের ভিতর থেকে কি চাই। কি করছি। সামনে কি করব। কোন পথে গেলে দিনশেষে কোন আফসোস থাকবে না?

এই পিট স্টপে নিজের এই আধ-ভাঙ্গা মনের গাড়িটাকে মেরামত করা, সামনে চলার ফুয়েল নেয়া, নিজের আল্টিমেট লক্ষ্যটাকে ঠিক করা, রেসের ট্রাকটা ঠিক করে রেডি থাকা। জীবনের এই রেসের সময়সীমা নির্দিষ্ট নাই। যে কোন সময় শেষ হয়ে যেতে পারে। এইখানে আরেকজনের সাথে জয়ী হওয়ার বিষয় নাই। এই রেস নিজের সাথে নিজের। অতীতের আমার সাথে বর্তমানের আমি, বর্তমানের আমার সাথে ভবিষ্যতের আমি। যদি রেস শেষে নিজের মনে নিজের জীবন নিয়ে আফসোস না থাকে তবেই আমরা জয়ী।

জীবনের এই পিট স্টপে আমি আমার ইচ্ছা, আমার লক্ষ্য, আমার শান্তিটাকে খুঁজছি। যাতে এই রেস শেষ হলে আমি নিজেকে বলতে পারি অন্যে কি বলবে, অন্যে কি ভাববে তার জন্য নিজের ভবিষ্যতকে বিসর্জন দিই নি। তা ইহকালিক বা পরকালিক যাই হোক না কেন।

হাদিসে আছে, তোমরা পাঁচটি বিষয়কে পাঁচটি বিষয় আসার পূর্বেই গুরুত্ব দাও এবং এর সদ্ব্যবহার কর – বার্ধক্যের পূর্বে যৌবনকে, অসুস্থতার পূর্বে সুস্থতাকে, দারিদ্রে্যর পূর্বে স্বচ্ছলতাকে, ব্যস্ততার পূর্বে অবসরকে এবং মরণের পূর্বে জীবনকে।

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে সময়ের সদ্ব্যবহার করার তৌফিক দিন।

পেশায় তড়িৎ প্রকৌশলী। মাঝে মাঝে কিছু লিখতে ইচ্ছা হয়। কিছু লিখি। তারপর আবার মুছে ফেলি। লেখা আর মুছে ফেলার মাঝে কিছু থেকে যায়। সেগুলোর জন্যই এখানে আসা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back To Top